জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকা হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের অধিকার আদায়ে গঠিত হয়েছে ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরাম’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ফোরামের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ঘোষণাপত্র’ উপস্থাপন করা হয়।
নবগঠিত সংগঠনটি সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন, শোভন কর্মসংস্থান এবং খাদ্য ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়সহ মোট ১১ দফা দাবি জানিয়েছে।
পৌরসভার ৪৭ বসতিতে ৭ হাজার ৫৭৩ পরিবার
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি বাস্তুচ্যুত পরিবার বসবাস করছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে এসব পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকা হারিয়ে শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, তাদের অনেকের বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। দীর্ঘ সময় পার হলেও তাদের নিরাপদ ও স্থায়ী বসবাসের অধিকার নিশ্চিত হয়নি।
যা আছে ১১ দফা দাবিতে
ফোরামের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন, নারী-পুরুষ ও তরুণদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণ। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আর্থিক সেবার সুযোগ সৃষ্টির দাবিও জানানো হয়েছে।
জরুরি খাদ্যসহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি, শিশু ও মাতৃত্বকালীন পুষ্টিসেবা, নিরাপদ পানির উৎস, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং বসতিগুলোর জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানিয়েছে ফোরাম।
এছাড়া পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ, বসতিগুলোর আইনি নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধন, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ এবং ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি তোলা হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা, তাদের জীবনযাত্রা ও মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের আহ্বানও জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে।
‘তারা কেবল ত্রাণের গ্রহীতা নন’
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষ কেবল ত্রাণ বা সহায়তার গ্রহীতা নন; তাঁরা এ দেশের নাগরিক এবং তাঁদেরও সমান অধিকার রয়েছে। নিরাপদ আবাসন, জীবিকা, শোভন আয়, খাদ্য, পুষ্টি, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি ফাতেমা বেগম। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সদস্যসচিব সোনিয়া খাতুন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় দুর্যোগ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা গওহর নঈম ওয়ারা, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (প্রাণ) প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মাসুদ এবং সিইপিআরের প্রধান নির্বাহী গৌরাঙ্গ নন্দী। এছাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় কৌশলপত্র বাস্তবায়নে আলোচনার অঙ্গীকার
নবগঠিত ফোরামের নেতারা জানান, জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ হিসেবে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের অধিকার ও দাবি তুলে ধরা হবে। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১ বাস্তবায়নে সরকার, জেলা প্রশাসন, সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তাঁরা জানান।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের আবাসন, জীবিকা ও নাগরিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সাতক্ষীরার এ উদ্যোগ। এখন দেখার বিষয়, নতুন এ ফোরামের ১১ দফা দাবি নীতিনির্ধারকদের কাছে কতটা গুরুত্ব পায় এবং দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে কি না।
Source: জাগো নিউজ২৪






