নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রায় প্রতিটিতেই আসামিরা অধরা বলে জানা গেছে। দিন, মাস, বছর এমনকি এক দশক পেরিয়ে গেলেও অনেক ঘটনার রহস্য অন্ধকারেই রয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে ছয়টি গুলি করে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর ১৮ অক্টোবর জেলার মোহনগঞ্জে আরেক ব্যক্তিকে গুলি করা হয়। এসব ঘটনায় এলাকায় আতংক বিরাজ করছে।
সাংবাদিক আলিফ হত্যা
গত বছরের ১১ নভেম্বর সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের ওপর হামলা করা হয়। ওইদিন বেলা একটার দিকে লুৎফুজ্জামান ও তাঁর সহকর্মী শাহজাহান শেখ দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী পার হতে একটি ভাড়া মোটরসাইকেলে করে তেরিবাজার ঘাটে নামেন। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন সেখানে আসেন। তাঁদের মধ্যে দুজন চাপাতি হাতে নিয়ে লুৎফুজ্জামানকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। এতে তাঁর দুই হাত, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয়। সঙ্গে থাকা শাহজাহান শেখ বাধা দিতে গেলে তাঁকেও কোপানোর চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা দৌড়ে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে তাঁকে সুস্থ হতে হয়। ঘটনার পর একই বছর ২৯ নভেম্বর বিকেলে জেলা পুলিশের তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম যোগদানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আহত সাংবাদিক আলিফ তাঁর ওপর হামলা ও হত্যার আশঙ্কার বিষয়টি পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন। তবে এরপরও কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
সেই ঘটনার এক বছর পর সাংবাদিক আলিফের আশঙ্কাই সত্যি হয়। ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে শ্বশুরবাড়ির পাশে একটি চায়ের দোকানে পরপর ছয়টি গুলি করে ঘটনাস্থলেই তাঁকে হত্যা করা হয়।
আলিফের ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা নেত্রকোনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, সাংবাদিক আলিফের বুকের অংশে তিনটি গুলি লাগে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের দিকে শরীরের ভেতরে আটকে ছিল। অপর তিনটি গুলির আঘাতের বিষয়ে তিনি জানান, একটি গুলি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আরেকটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে চলে যায়।
ক্ষতের ধরন বিশ্লেষণ করে শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ বলেন, ‘শরীরে গুলির প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আলিফকে সামনে থেকে গুলি করা হয়েছে।’
১১ বছরেও রহস্য উদঘাটন হয়নি ব্যবসায়ী দম্পতি হত্যার
২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার শেষ দিন ভোর থেকে বেলা একটার মধ্যে নিজ বাসার তিনতলার কক্ষে খুন হন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সাহা (৭৪) ও তাঁর স্ত্রী হেনা রানী সাহা (৬৫)। অরুণ কুমার সাহা দুর্গাপুর পৌরশহরের মধ্যবাজার এলাকায় ‘সুবর্ণা প্লাজা’ নামের তিনতলা মার্কেট ও সেখানকার সুবর্ণা বস্ত্রালয়ের মালিক ছিলেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা প্লাজার তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
এই দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট ছেলে সুদীপ কুমার সাহা ও মেয়ে সুলেখা সাহা ইতালি এবং বড় মেয়ে সুবর্ণা সাহা কানাডায় থাকেন। বড় ছেলে সুজিত কুমার সাহা মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। সুজিতের স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন।
অরুণ কুমার ও তাঁর স্ত্রী হেনা রানী নিহত হওয়ার আগের দিন সুজিত কুমার মা-বাবাকে বাসায় রেখে ঢাকায় যান। পরদিন (২৩ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে তিনি মা-বাবার খোঁজ নিতে মুঠোফোনে কথা বলতে চান। কিন্তু সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুপুরে পাশের বাসার কাকা অজিত কুমারকে ফোন করে বিষয়টি খোঁজ নিতে বলেন। পরে অজিতের স্ত্রী সুচিত্রা তৃতীয় তলায় অরুণের বাসার দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢোকেন এবং পৃথক দুটি কক্ষের মেঝেতে গলা কাটা ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অরুণ ও হেনার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও অন্তত নয় বার পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটি তদন্ত করছিল। শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দুর্গাপুর থানা-পুলিশের কাছ থেকে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়া হয়। সিআইডি তদন্ত নেওয়ার পর তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। সিআইডির সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা নেত্রকোনা সিআইডিতে দায়িত্বে থাকা তখনকার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শংকর কুমার দাস ২০১৭ সালের শেষ দিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
শংকর কুমার দাস তখন বলেছিলেন, ‘এই জোড়া খুনের তদন্তভার এক বছর চলে যাওয়ার পর আমাকে দেওয়া হয়েছিল। অনেক দিন চলে যাওয়ায় খুনের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। কিছুই সংরক্ষিত হয়নি। সন্দেহে থাকা কয়েকজনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কল রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।’
মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পরবর্তী সময়ে বাদী নারাজি আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। এরপর পিবিআইয়ের পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ পরিদর্শক অভি রঞ্জন দেব তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে দুর্গাপুর চৌকি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভি রঞ্জন দেব বলেছিলেন, ‘ক্রাইম সিনসহ প্রয়োজনীয় আলামত তখন সংরক্ষণ না করায় মামলাটি নিয়ে খুবই বেগ পেতে হয়। কোনো কিছু না পেয়ে শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।’
এসআই শফিকুলকে কুপিয়ে হত্যা
২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওইদিন ছুটিতে এসে পৌর শহরের বাগিচাপাড়া এলাকার বাসা থেকে বের হন তিনি। সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার পর পানমহাল রোড এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। ওই দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনামা ছয়জনকে আসামি করা হয়। হত্যাসংক্রান্ত একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শফিকুল ইসলামকে তিনজন যুবক রামদা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছেন। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পিবিআই ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা কার্যালয় যৌথ অভিযান চালিয়ে পরদিন শনিবার বিকেলে সাজিবুল ইসলাম (২৮) ও মো. বাকী বিল্লাহ (৩০) নামের দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁরা কিছুদিন কারাগারে থেকে জামিনে বের হন।
নিহত এসআই শফিকুল ইসলাম দুর্গাপুরের চণ্ডীগড় ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি জামালপুর পুলিশ লাইনসের বেতার বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা হত্যা
পূর্ব বিরোধের জেরে ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের রাশিমনি বাজারে ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমার ওপর আধিপত্য নিয়ে হামলা করে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবদুল আওয়ালের ভাই মো. শামিম আহমেদের (শুটার শামীম) নেতৃত্বে একটি দল। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ওইদিন রাতে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরদিন রাতে সুব্রত সাংমার বোন কেয়া সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আব্দুল আওয়ালসহ তাঁর ভাই শামিম, মো. বদিউজ্জামানসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলার পর আসামিরা আদালত থেকে আগাম জামিন নেন।
আধিপত্য বিস্তারে মজিবুরকে কুপিয়ে হত্যা
২০২৪ সালে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মজিবর রহমান (৫১) ওরফে দা মজিবরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি দুর্গাপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিরিশিরি ইউনিয়নের নলজোরা গ্রামের বাসিন্দা মৃত সুরুজ আলীর ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মারামারি, সীমান্তে পাচার ব্যবসাসহ প্রায় ১২টি মামলা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মো. শামিম মিয়া (৩৩) ওরফে শুটার শামিম ও মজিবুরের মধ্যে সীমান্তে চোরাচালান ব্যবসা ও আধিপত্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এরই জের ধরে ওইদিন সকালে সুসং সরকারি মহাবিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মজিবুর রহমানের ভাতিজার সঙ্গে কুল্লাগড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়ালের ছেলের ঝগড়া হয়। এর রেশ ধরেই দুপুরে দক্ষিণ ভবানীপুর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে গুরুতর আহত মজিবর রহমানকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
সাম্প্রতিক দুই ঘটনায় নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রেজওয়ান আহমেদ বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশের কয়েকটি ইউনিটসহ এসআরবির স্পেশাল টিম কাজ করছে।
সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আলিফ হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্ত করে তাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। তিনি আরও বলেন, সীমান্তের চোরাচালান, মাদকসহ সব অবৈধ কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি।
Source: জাগো নিউজ২৪






