ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অনিয়ম, হয়রানি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এক রোগীর স্বজনকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন এক দালাল।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালটি আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এসব অভিযোগ শোনেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। এ সময় হাসপাতালের জরাজীর্ণ পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ।

পরিদর্শনকালে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগ ঘুরে দেখেন দুদকের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এ সময় তাঁরা রোগীদের শয্যাপাশে গিয়ে চিকিৎসাসেবার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং সাধারণ রোগীদের বিভিন্ন অভিযোগ ও ভোগান্তির কথা শোনেন।

প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুদকের কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া এবং সচিব মো. সাইদুর রহমান খানসহ সংস্থাটির অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় রোগীরা দুদক কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন। বিশেষ করে হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং অসহায় রোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেন তাঁরা।

চাঁদপুরের মতলবের নালুয়া আশ্রম থেকে আসা এক রোগীর স্বজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) কান্নায় ভেঙে পড়ে অভিযোগ করেন, ‘এখানে ভালো চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এক দালাল আমার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু এখন তাকে খুঁজে পাচ্ছি না, তার কোনো খবরও জানি না। আমার স্বামী একজন সামান্য রিকশাচালক। আমাদের পক্ষে এত টাকা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’

রোগীদের দুর্দশা ও অভিযোগগুলো অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শোনেন দুদক চেয়ারম্যান। এ সময় তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সেবার মান দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি সব ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য অবিলম্বে বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।

পরিদর্শন শেষে দুপুর ১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। ঢামেক হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘হাসপাতালে কোনো রকম ব্যবস্থা নেই। রোগীরা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানে এসে একেবারে জরাজীর্ণ পরিবেশ দেখলাম। সারা দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা প্রায় একই রকম। তবে ঢাকায় যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে মফস্বল বা সারা দেশের অবস্থা আরও খারাপ।’

তিনি বলেন, ‘মেডিকেল থেকে কৌশলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ জড়িত কি না, সেটিও আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের মৌলিক অধিকার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও সিন্ডিকেট রুখতে সবসময় তৎপর রয়েছে দুদক।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আগে নিয়মিত ওষুধ পাওয়া না গেলেও বর্তমানে রোগীরা অর্ধেকের বেশি ওষুধ পাচ্ছেন। আগের তুলনায় চিকিৎসাসেবার মানও কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে পুরো ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিতমানে উন্নীত করতে কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, দুজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনারের উপস্থিতিতেই হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের অভিযোগগুলো স্বচক্ষে দেখেছেন। এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আপনারা জানেন, এখানে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৬০০ শয্যায় এবং বহির্বিভাগে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর রোগী আসেন। রোগীর প্রচণ্ড চাপের কারণে কেউ যাতে অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে ফিরে না যান, সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট আছি।’

হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও পুরো টিম একসঙ্গে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। আমরা আশা করি, অচিরেই পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’

প্রেস ব্রিফিং শেষে দুপুর সোয়া ১টার দিকে দুদক চেয়ারম্যান ও তার সফরসঙ্গী কর্মকর্তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ত্যাগ করেন।

Source: জাগো নিউজ২৪