সরকারের পর্যাপ্ত নীতিসহায়তা না পাওয়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে নেমেছে। রপ্তানি বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আরও ব্যবসাবান্ধব সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঢাকার বনানী ক্লাবে একটি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ফারুক হাসান। বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএএমইএ) তিন দিনের এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
আমদানিনির্ভর শিল্পের জন্য সহায়তা
ফারুক হাসান বলেন, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে তুলা ও পেট্রোকেমিক্যালসহ নানা কাঁচামাল বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। দেশে জমির স্বল্পতার কারণে তুলার উৎপাদন অনেক বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। আবার কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বা নন-কটন পোশাক তৈরিতে যে পেট্রোকেমিক্যাল দরকার, দেশেও তার পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই।
তাঁর বক্তব্য, এমন আমদানিনির্ভর শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নীতিসহায়তা দরকার। অথচ নীতিসহায়তার ঘাটতিই বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুতা আমদানিতে স্থলবন্দর ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। তিনি জানান, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর স্থলবন্দর দিয়ে পার্সেল চালান আনার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আমদানির জন্য স্থলবন্দর ব্যবহারের সেই সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
ফারুক হাসানের দাবি, এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে রপ্তানিতেও। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কাঁচামাল আনার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে কারখানার উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিও ক্ষতির মুখে পড়ে।
প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও বিধিনিষেধ আসতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কোনো নীতি নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব অবস্থা ও উৎপাদনক্ষমতা পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি ওই সিদ্ধান্ত রপ্তানিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পণ্য খালাসে অস্পষ্টতার অভিযোগ
সুতা আমদানি ও বন্ড সুবিধা নিয়ে এনবিআরের পরিপত্রের বিষয়েও কথা বলেন ফারুক হাসান। তিনি জানান, ৭ সেপ্টেম্বরের আগে খোলা ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে আসা পণ্য খালাসের সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরের পরিপত্রে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা স্পষ্ট করা হয়নি।
তাঁর ভাষ্য, এই অস্পষ্টতার কারণে বন্দরে বহু কনটেইনার আটকে আছে। ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়ে পণ্য ছাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও অনেক প্রতিষ্ঠান তা করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, পরিপত্র জারি করেছে এনবিআর, আবার সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও সংস্থাটির আওতাধীন দপ্তরগুলোর। বন্ড ও কাস্টম হাউস—দুটিই এনবিআরের অধীনে পরিচালিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফারুক হাসানের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নীতির এ অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত সময়ে ছাড় না পেলে কারখানার উৎপাদন এবং রপ্তানির কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিযোগীদের অগ্রগতি দেখার আহ্বান
ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অগ্রগতিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানান ফারুক হাসান। তিনি বলেন, ইউরোপের ডেনিম বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। তবে অন্য দেশগুলো এগিয়ে আসায় তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান এখন কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এখন চীন বাংলাদেশকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় হয়েছে, আর বাংলাদেশ নেমেছে তৃতীয় অবস্থানে।
ফারুক হাসান বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য কেবল উৎপাদনক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে ধারাবাহিক নীতিসহায়তা, কাঁচামাল আমদানির সহজ প্রক্রিয়া এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষণে টেকসই প্যাকেজিংয়ে গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএপিএমইএর সাবেক সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন মতি। সভাপতিত্ব করেন বিপিএএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার।
এশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশনের (এপিএফ) সহযোগিতায় বিপিএএমইএ আয়োজিত কর্মসূচির নাম ছিল ‘বিপিএএমইএ–এপিএফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং প্রোগ্রাম–২০২৬’। তিন দিনের প্রশিক্ষণের প্রতিপাদ্যে স্থানীয় ও বিশ্ববাজারের উপযোগী টেকসই, মানসম্পন্ন প্যাকেজিংকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দেশের প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ শিল্পের দক্ষতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববাজারে খাতটির প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়ানোও ছিল কর্মসূচির লক্ষ্য।
Source: জাগো নিউজ২৪






