দেশের প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাতের বিকাশে নীতিসহায়তা, দক্ষ জনবল এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর বনানী ক্লাবে বিপিএএমইএর উদ্যোগে ও এশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশনের (এপিএফ) সহযোগিতায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বিপিএএমইএ–এপিএফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং প্রোগ্রাম–২০২৬’ শীর্ষক ওই কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য টেকসই ও মানসম্মত প্যাকেজিং’। প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ছিল দেশের প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা জোরদার করা।
শাহরিয়ার বলেন, এ খাতে দেশে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু যথাযথ নীতিসহায়তা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোনো যাচ্ছে না।
দক্ষ কর্মীর ঘাটতি
তিনি জানান, প্যাকেজিং খাতে বর্তমানে ২০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষিত জনবল প্রয়োজন হচ্ছে, কিন্তু সে সরবরাহ মিলছে না। ঘাটতি মেটাতে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও চীন থেকে কর্মী নিয়োগ করে দেশে আনতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈশ্বিক বাজারে প্যাকেজিং শিল্পের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে বিপিএএমইএ সভাপতি জানান, কাগজের প্যাকেজিংয়ের বিশ্ববাজার প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের এবং সামগ্রিক প্যাকেজিং বাজার ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নীতিসহায়তার ঘাটতির মধ্যেও দেশে প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাত গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন শাহরিয়ার। করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই খাতের সক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষায়, পোশাকশিল্পসহ দেশের বিভিন্ন উৎপাদন খাতে যত প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ প্রয়োজন, তার সরবরাহে স্থানীয় উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নীতিসহায়তার অভাব
দেশে বিশ্বমানের পোশাক উৎপাদিত হচ্ছে এবং এসব পণ্যের প্যাকেজিংয়ের বড় একটি অংশ স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান শাহরিয়ার। তবে দক্ষ জনবল ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্যাকেজিং পণ্য রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করাও প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং খাতে একটি মেশিনের দাম ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান তিনি। এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য দেশে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নেই বলে তিনি জানান। এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে এই খাতের উপযোগী পাঠ্যক্রম চালুর বিষয়ে কাজ করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম প্যাকেজিং শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বানও জানান তিনি।
স্বতন্ত্র শিল্পের দাবি
প্যাকেজিং খাতকে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন শাহরিয়ার। তিনি জানান, গত বছর অনেক চেষ্টার পর কাগজের প্যাকেজিংকে বর্ষপণ্য ঘোষণার উদ্যোগ সফল হয়েছে। বর্তমান সরকারপ্রধানের সঙ্গে এই খাতের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনাও হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রিন্টিং, প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাতকে শুধু সহযোগী খাত হিসেবে না দেখে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ব্যবসার স্থায়িত্ব নিশ্চিত না করে পণ্যের টেকসই উৎপাদন নিয়ে আলোচনা যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রথমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে; এরপর পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্যাকেজিংয়ের দিকে আরও কার্যকরভাবে এগোনো সম্ভব হবে।
অ্যাকসেসরিজে এফওসি সুবিধার দাবি
অনুষ্ঠানে পোশাকশিল্পের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের ঘাটতির প্রসঙ্গও তোলেন বিপিএএমইএ সভাপতি। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও বিপিএমইএর পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে দেশের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বিদেশ থেকে বিনা মূল্যে সরবরাহ করা অ্যাকসেসরিজ বা ট্রিমসের ক্ষেত্রে এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে পণ্য আনলে এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে, তবে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনারা বিদেশ থেকে অ্যাকসেসরিজ এফওসি আনতে পারবেন, আমি লোকাল এখানে এফওসি দিতে পারব না কেন? আপনার এফওসি তো খুলে দেন, আমাদের কোনো আপত্তি নাই।’
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করে নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন শাহরিয়ার। বিদেশি পণ্যের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং পণ্য ব্যবহারের সুযোগও বাড়াতে হবে বলে তিনি জানান।
রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শাহরিয়ার। তাঁর মতে, রপ্তানি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি জানান, একই সময়ে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এভাবে নিজেদের ভিতরে মতানৈক্য করে চলতে থাকি, আমাদের সেক্টর এবং বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের যে খাত, সেটি কিন্তু অকেজো হয়ে যাবে।’
ব্যবসায়ী নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শাহরিয়ার বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা কেউ কারও প্রতিপক্ষ নন। উভয় পক্ষই দেশের স্বার্থে কাজ করেন। তাই একে অন্যের দোষারোপ না করে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এ ছাড়া বক্তব্য দেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএপিএমইএর সাবেক সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন মতি।
Source: জাগো নিউজ২৪






