নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বাড়তি এ ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া বাড়ানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নিলামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরে গতকাল পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আজকের নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা উঠলে মাসটিতে সরকারের ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে সরকার ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণেই স্বল্পমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামের আয়োজন করা হয়েছে।

সাধারণত সরকার ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে ১৪ দিন মেয়াদি বিল ইস্যু করা হয়। তবে নিলামে তোলা বিল-বন্ডের পুরো অঙ্ক সরকারের নিট ঋণ নয়। এর বড় একটি অংশ আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

বাড়ছে ঋণের সুদহার

সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ বাড়ায় ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে। অথচ ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত আগস্ট শেষে দেখা গিয়েছিল। বিপুল তারল্য থাকা সত্ত্বেও সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়ায় বিল-বন্ডের সুদহার বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ করতে না পারায় সরকারের ব্যাংকঋণের প্রয়োজন বাড়ছে। চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ঋণের জোগান দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য রয়েছে। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়লে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়ছে ব্যাংকনির্ভরতা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে আগামী দিনগুলোতে সরকারের অর্থায়নের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Source: জাগো নিউজ২৪