যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার ইরানে হামলা চালালে পারস্য উপসাগরে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া যোগাযোগ ক্যাবলগুলোতে আঘাত হানার বিস্তারিত পরিকল্পনা সাজিয়েছে তেহরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন দেশটির দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে গেলে নতুন সংঘাত বাধতে পারে এবং তখন এসব ক্যাবল নিশানা হতে পারে বলে ইরানি কর্মকর্তারা আগেই হুঁশিয়ার করেছিলেন।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা দুই কর্মকর্তা পরিকল্পনার খুঁটিনাটি, কিংবা কোথায় ও কীভাবে হামলা হতে পারে, তা খোলাসা করেননি। তবে তাঁদের একজন বলেছেন, হামলার পর মেরামতকাজেও বাধা দেবে ইরান, যাতে ইন্টারনেটসহ যোগাযোগসেবা লম্বা সময় বিঘ্নিত থাকে। তাঁর ভাষ্য, ইরান আক্রান্ত হলে কোনো সীমারেখাই আর থাকবে না; সমুদ্রতলের ক্যাবল থেকে গোপন সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত সবই নিশানায় পরিণত হতে পারে।

ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না।’ তাঁর দাবি, ক্যাবলগুলো কোথায় আছে এবং কীভাবে চালানো হয়, তা ইরানের ভালোভাবেই জানা, চাইলে দেশটি অনায়াসে সেগুলো ধ্বংস করতে পারে। এসব বক্তব্যের বিষয়ে রয়টার্স ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মন্তব্য চাইলেও সাড়া মেলেনি; উপসাগরীয় দেশগুলোও তাৎক্ষণিক কিছু বলেনি।

এর আগে গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির রাজনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদোল্লাহ জাভানি সতর্ক করেছিলেন, দেশের অবকাঠামোয় আঘাত এলে হরমুজ প্রণালির তলদেশের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট ক্যাবল তেহরানের নিশানা হতে পারে। চলতি মাসে দেশটির জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইও সতর্ক করেন, সংঘাত ফিরলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্থাপনার মতো ডিজিটাল অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

দ্বিতীয় কর্মকর্তা বলেন, এসব অবকাঠামোতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে; ক্যাবলের কোনো ক্ষতি হলে তার দায় তেহরানের নয়, ওয়াশিংটনের। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, এ ধরনের হুমকি দিয়ে নতুন যুদ্ধ ঠেকাতে ও ওয়াশিংটনকে চাপে রাখতে চায় তেহরান। তাঁর ব্যাখ্যা, ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়ে মার্কিন কোম্পানি ও উপসাগরীয় সরকারগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে তেহরান চাইছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি তাদের বিনিয়োগে কী ঝুঁকি তৈরি করছে, সে প্রশ্নে তারা তাঁর ওপর চাপ দিক।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য বলছে, বিশ্বের ইন্টারনেট যোগাযোগের প্রায় ৯৯ শতাংশ সমুদ্রতলের ক্যাবলনির্ভর; তবে ইরান ও ওমানের মাঝের হরমুজ প্রণালিতে হামলা হলেও বৈশ্বিক ইন্টারনেটে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। টেলিজিওগ্রাফি নামের টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক অ্যালান মল্ডিন জানান, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের এক শতাংশের কম অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে কয়েকটি ক্যাবল কাটা পড়লে ইন্টারনেট ধীর হয়ে যেতে পারে এবং অনলাইন বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও ক্লাউড সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে; ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে কত দ্রুত বিকল্প পথে তথ্য পাঠানো যায়, তার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবল সারানো কঠিন হতে পারে; বিমার খরচ বাড়া আর অন্য দেশের জলসীমায় ঢোকার অনুমতিতে দেরি সেই কাজ আরও জটিল করবে। গত মার্চে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালায় ইরান, আর সেই মাসেই মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল ও এনভিডিয়াসহ বেশ কিছু মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে বৈধ নিশানা ঘোষণা করে আইআরজিসি। অবশ্য স্থলপথের সংযোগ দিয়েও তথ্য বিকল্প পথে পাঠানো যায়; এমন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি ও উপসাগরীয় দেশগুলো, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রতল ও স্থলভাগের যোগাযোগ অবকাঠামো গড়তে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে মাইক্রোসফট।