তিন দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় দিয়ে দর্শকের মন জয় করা অভিনেতা সমু চৌধুরী এখন সম্পূর্ণ অন্য এক জীবনে আছেন। মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে ‘লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন’-এর ব্যস্ততা পেছনে ফেলে তিনি এখন ভবঘুরে ও নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। মাঝেমধ্যেই তাঁর এই জীবনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে আসছে।
জাগোনিউজ বিনোদনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব রিল তৈরির সময় ইউটিউবাররা অসুস্থ এই অভিনেতাকে আরও অসুস্থ করে তুলছেন বলে অভিযোগ করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু। তবে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাঁকে কিছুটা স্বস্তির জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
যশোর থেকে পর্দায়
সমু চৌধুরীর জন্ম ১৯৬৪ সালের ৮ জুন, যশোরে। ছাত্রজীবনে আশির দশকে যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রায় ১০ বছর পথনাটক, মঞ্চনাটক ও গণসংগীতে অংশ নেন তিনি। এরপর ঢাকায় গিয়ে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার-সিএটিতে যুক্ত হন। পাশাপাশি ঢাকা উদীচী, ঢাকা থিয়েটার ও নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গেও কাজ করেন।
১৯৯০ সালের ২২ মার্চ আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর অভিষেক হয়। প্রথম নাটকের জন্য সম্মানী পেয়েছিলেন ৭০০ টাকা। এরপর ‘জন্মভূমি’, ‘বিবর্ণ প্রজাপতি’, ‘কালো জোছনা’, ‘রঙের মানুষ’, ‘নিশিকুটুম্ব’ ও ‘উঠোন’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে পরিচিতি পান তিনি।
১৯৯৫ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘আদরের সন্তান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়। পরে ‘মায়ের অধিকার’, ‘দেশ দরদী’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘গলুই’ ও ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও কাজ করেছেন এই অভিনেতা; ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ (২০২৪) ও ‘নয়া নোট’ (২০২৫)-এর মতো কাজে তাঁকে দেখা গেছে। পাঁচ শতাধিক নাটক ও ডজনখানেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
অভিনয়জীবনের একপর্যায়ে প্রায় তিন বছর কাজ থেকে দূরে ছিলেন সমু চৌধুরী। ঢাকার কাজ ছেড়ে যশোরের গ্রামের বাড়িতে চলে যান তিনি। পরে শিল্পী ঐক্য জোটের মাধ্যমে আবার অভিনয়ে ফেরেন।
পরিবারে একের পর এক শোক
১৯৯৩ সালের ২৬ জুলাই সমু চৌধুরীর জীবনে বাঁক বদলে যায়। ওই দিন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবিকে নিয়ে ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আবুল কাশেম চৌধুরী। যশোরের নাভারন থেকে ফেরার পথে ঝিকরগাছা এলাকায় এই দুর্ঘটনায় বাবা ও বোনকে হারান তিনি। ২০১৮ সালে ছোট ভাই সনু চৌধুরীকেও হারান সমু চৌধুরী।
বাবা ও ছোট বোনের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। এক সাক্ষাৎকারে সমু চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মায়ের দেখাশোনার কথা বিবেচনা করেই তিনি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যক্তিজীবনে অবিবাহিত এই অভিনেতার জীবনে মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ তাই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
নাট্যাঙ্গনে অগ্রজের ভাষ্য
নাট্যাঙ্গনে সমু চৌধুরীর অগ্রজ যশোরের প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব আব্দুল আফফান ভিক্টর বলেন, আশির দশকে উদীচী যশোরে যুক্ত হওয়ার পর নব্বইয়ের দশকে তিনি ঢাকায় চলে যান। অভিনয়প্রতিভা দিয়ে তিনি দর্শকের মন জয় করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-বোন এবং পরবর্তীতে ভাইকে হারিয়ে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
মাজারে মাজারে ছড়াচ্ছে ছবি-ভিডিও
অভিনয় দিয়ে দর্শকের মন জয় করা সমু চৌধুরীর বোহেমিয়ান জীবনের কিছু ছবি ও ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো বাজারে, কখনো মাজারে, আবার কখনো গানের আসরে তাঁর উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ছে।
২০২৫ সালের জুনে প্রথম ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মুখী শাহ মিসকিন মাজারে গামছা পরা অবস্থায় সমু চৌধুরীর একটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি জানান, ওরস উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কাপড় শোকানোর সময় গামছা পরে গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর স্বজন ও অভিনয়শিল্পী সংঘের সদস্যরা সেখানে যান; পুলিশ তাঁকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর তিনি যশোরে মায়ের কাছে ফিরে যান।
এ বছর গত ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কের নতুন বাজার এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন সমু চৌধুরী। সর্বশেষ লালন শাহের মাজারে তাঁর কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউটিউবারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চিকিৎসার উদ্যোগ
প্রিয় এই অভিনেতার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে। তাঁর এই পরিস্থিতি অনেককে নাড়া দিয়েছে; তাই চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু জানান, জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা সমু চৌধুরীর বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় তাঁরা ব্যথিত। তবে তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে ইউটিউবাররা। তিনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে রিল তৈরির জন্য ইউটিউবাররা তাঁকে ঘিরে ধরে উত্ত্যক্ত ও উত্তেজিত করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি ইউটিউবারদের সমু চৌধুরীকে বিরক্ত না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
দুলু আরও জানান, বৃদ্ধা মা ছাড়া সমু চৌধুরীর পরিবারে আর কেউ নেই। তাই পরিবারের অন্য স্বজন, স্থানীয় সুহৃদ ও তাঁর সংগঠন উদীচীকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব জানান, সমু চৌধুরীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা অত্যন্ত চিন্তিত ও ব্যথিত। সে কারণে তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব দ্রুতই আলোচনা করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ জন্য তিনি সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন।
Source: জাগো নিউজ২৪






