টানা দেড় দশক বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব সামলানো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার যাচ্ছেন বঙ্গভবনে; বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা ভোটে ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন অংশ নেন, তাদের ২৫৫ জনের ভোট পান মির্জা ফখরুল। অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের হয়ে লড়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে পড়ে ৮৮ ভোট।
ভোট শেষে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল জানালে টেবিল চাপড়ে অভিনন্দন জানান সংসদ সদস্যরা; প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির হাতে একটি গোলাপ তুলে দেন, আর বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান এগিয়ে এসে হাত মেলান। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় আইন মেনে ভোটের আয়োজন করতে হয়, আর দেশের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিনের গত ২৪ জুলাইয়ের পদত্যাগের প্রায় চার সপ্তাহ পর দেশ নতুন রাষ্ট্রপতি পেল; শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে তাকে শপথ পড়াবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়; ইসির ২০ জন কর্মকর্তা নিজ নিজ আসনে বসা সংসদ সদস্যদের হাতে ব্যালট পৌঁছে দেন, আর তা জমা পড়ে তিনটি বাক্সে। ২টা ৮ মিনিটে প্রথম ভোটটি দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার, তারপর মির্জা ফখরুলকে পাশে নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান; পরে নিজের ভোট দিয়ে মির্জা ফখরুল সামনের সারির বিরোধী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে হাত মেলান, আর শফিকুর রহমান ভোট দেন ২টা ১৯ মিনিটে। চিকিৎসাধীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮)সহ ছয় সংসদ সদস্য ভোট দেননি; বাকিরা হলেন ড. ওসমান ফারুক (কিশোরগঞ্জ-৩), মোস্তফা কামাল পাশা (চট্টগ্রাম-৩), স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান (সিলেট-৫) এবং জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৪)।
প্রথম দেড় ঘণ্টাতেই উপস্থিত সবার ভোট দেওয়া শেষ হলেও নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, এর মধ্যে সোয়া ঘণ্টার বেশি সময় নিজের আসনে কাটিয়ে ৩টা ১৩ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী মির্জা ফখরুলকে সঙ্গে নিয়ে সংসদ ভবনে নিজের কার্যালয়ে চলে যান; ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হলে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তা দেখেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামসহ কয়েকজন হুইপ। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে ফল জানিয়ে সিইসি বলেন, ছাপানো ৩৪৯টি ব্যালটের মধ্যে ব্যবহার হয়েছে ৩৪৩টি, যার সবই বৈধ, আর ৬টি অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কয়েকজনের সঙ্গে কোলাকুলি করেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি; বিরোধী শিবির থেকে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিনন্দন জানান, শুভেচ্ছা আসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকেও, আর রাতেই গেজেট প্রকাশ করে ইসি।
ফল ঘোষণার পর বৃহস্পতিবারই পৃথক বার্তায় নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানায় ঢাকায় চীনের ও ফ্রান্সের দূতাবাস এবং ব্রিটিশ হাইকমিশন। চীনা দূতাবাস জানায়, বেইজিং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায় গড়তে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ব্রিটিশ হাইকমিশন দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব আরও মজবুত করতে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের সঙ্গে কাজ করার আশা প্রকাশ করে, আর ফ্রান্স দূতাবাস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় প্রবীণ এই রাজনীতিকের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়িতে জন্ম মির্জা ফখরুলের; বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, দুবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, পরে জাতীয় সংসদ সদস্য ও এরশাদ সরকারের মন্ত্রী, আর মা মির্জা ফাতেমা আমিন; স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন, তাদের দুই কন্যা মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র থাকাকালে ষাটের দশকে তিনি বাম ধারার ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হয়ে এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হন এবং ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে থেকে কারাবরণ করেন। স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৭২ সালে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে পড়ান, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন এবং ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস হন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে আসা মির্জা ফখরুল ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হন; ভাসানীর ন্যাপ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি হলেও ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন, পরে কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ও সভাপতি, ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য হয়ে খালেদা জিয়ার সরকারে কৃষি ও বিমান প্রতিমন্ত্রী হন; ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ থেকে জয়ী হলেও দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে সংসদে যাননি, আর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ থেকে জিতে তারেক রহমানের সরকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, সংসদে তার আসন ছিল প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পাশেই। এক-এগারোর পরের প্রতিকূল সময়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার প্রায় দুই বছরের কারাবাস ও পরে অসুস্থতা এবং ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে থেকে তারেক রহমানের দল পরিচালনার দিনগুলোতে মাঠে বিএনপিকে সামলেছেন মির্জা ফখরুল।






