বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমদ ২০১৫ সালে কীভাবে দেশ থেকে নিখোঁজ হয়ে ভারতের শিলংয়ে পৌঁছেছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে সেই রহস্যের বড় অংশ এখন পরিষ্কার হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ওই বছরের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরায় একটি বাসা থেকে তিনি নিখোঁজ হন; ৬১ দিন পর ১১ মে মেঘালয়ের শিলংয়ে দিশেহারা অবস্থায় স্থানীয় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরার বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর প্রায় ৬১ দিন তাকে দেশের ভেতরে একটি টিএফআই সেলে (আয়নাঘর) আটক রাখা হয়, এরপর সীমান্ত পার করিয়ে শিলংয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এ গুমের তদন্ত এখন শেষ ধাপে; আসামিদের বিরুদ্ধে মূল তথ্য-প্রমাণ মিলেছে, অনেকে ইতোমধ্যে কারাগারে আছেন এবং আরও কয়েকজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংগৃহীত প্রমাণ যাচাই শেষে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে প্রসিকিউশন।

সে সময় তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ অভিযোগ করেছিলেন, ১০ মার্চ রাতে উত্তরার ওই বাসা থেকে তার স্বামীকে তুলে নেওয়া হয়; বিএনপিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করে। শিলংয়ে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা তাকে দিশেহারাভাবে ঘুরতে দেখে পুলিশে খবর দিয়েছিলেন। পরে সেখানকার একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয় এবং বৈধ পাসপোর্ট বা ভারতে ঢোকার কাগজ না থাকায় ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।

দীর্ঘদিন পর সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ, যিনি এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’-এর এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আটক থাকার সময় দিন না রাত তা বোঝার উপায় ছিল না, প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো পরের ভোর আর দেখতে পাবেন কি না। ৬১ দিন পর তিনি টের পান, তাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে; পথে লোকজনের মুখে হিন্দি শুনে তার মনে হয়, তাকে ভারতের কোনো এলাকায় নেওয়া হচ্ছে।

এরপর চোখ বাঁধা অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা পথ চলার পর ভোরের দিকে তার চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। সামনে একটি চৌরাস্তা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা আর বড় একটি মাঠ দেখতে পান তিনি; পরে জানতে পারেন জায়গাটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা। সেখানে এক নির্জন জায়গায় গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’।

তদন্তের অংশ হিসেবে ভারতের ওই মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করেছে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর জানান, এসব নথিতে সালাহউদ্দিনের নিজের, তার পরিবারের সদস্যদের, চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকের এবং তাকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য রয়েছে; এগুলো বিশ্লেষণ করে প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে অপহরণ করে সেখানে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। ভারতের নিম্ন আদালত ২০১৮ সালে তাকে খালাস দেন এবং ভারত সরকারের আপিলের পর ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালতও সেই খালাস বহাল রাখেন।

খালাস পাওয়ার পর ভ্রমণ অনুমোদন চেয়ে তিনি আবেদন করেন ২০২৩ সালের ৮ মে; ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ট্রাভেল পাস হাতে পান এবং পাঁচ দিন পর ১১ আগস্ট প্রায় নয় বছর পর দেশে ফেরেন। ২০২৫ সালের ৫ জুন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তিনি যে অভিযোগ দাখিল করেন, তাতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম রয়েছে: পুলিশের বিশেষ শাখার সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক দুই আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক ও বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান; অজ্ঞাতনামা আরও ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। জিয়াউল আহসানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।