মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চালানো হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নাম আসার পর সংসদ সদস্য পদ ছেড়েছেন বিএনপির নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ ওরফে মিষ্টি; বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) স্পিকারের কাছে গিয়ে তিনি পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করলেও এর মধ্যেই বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসন-২৩, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর আসন, সংবিধানের ৬৭ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১ অক্টোবরেই শূন্য হয়েছে; এতে মাত্র পাঁচ মাসের মতো সময়ে শেষ হলো ৩ মে শপথ নেওয়া এই সংসদ সদস্যের প্রথম মেয়াদ।
মিষ্টির জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি; স্নাতক ডিগ্রিধারী এই ব্যবসায়ীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে, পরে সেখানে ছাত্র সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নির্বাচিত হন, আর সেসময় বড় ভাই পিন্টুও ছাত্রদলে সক্রিয় ছিলেন। ২০০২ সালে স্বামী সাইদুর রহমান ওরফে নিউটন খুন হলে তার ওয়ার্ডে, অর্থাৎ অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে উপনির্বাচন হয়, আর তাতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ওয়ার্ড নয়, সাধারণ ওয়ার্ডে সরাসরি ভোটে জিতে কমিশনার হয়ে স্থানীয় সরকারে পা রাখেন মিষ্টি। পরেও সাধারণ ওয়ার্ডেই ভোট করেছেন তিনি; ২০২০ সালে সিটি নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তৃতীয়বার সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হচ্ছেন, এবং দাবি করেছিলেন, এলাকার গ্যাসলাইনের সমস্যা মিটিয়েছেন, অবৈধ দখলমুক্ত করে শিশুদের খেলার মাঠ করে দিয়েছেন, তার সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও কমেছে।
গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে সচেতনতার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি; আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক শোভাযাত্রায় স্কুলের শিক্ষার্থী, গৃহকর্মী আর এলাকাবাসীকে নিয়ে নেতৃত্ব দেন, আর তার নির্দেশনায় ওয়ার্ডের বাসাবাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ ও অবস্থা দেখভালে একটি কমিটি হয়। ২০১৮ সালে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি থাকাকালে ওই বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন মিষ্টি, তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকার জেরে তাকে ২০টি মামলার আসামি হতে হয়েছে, যেগুলোকে তিনি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন। সদ্য ভেঙে দেওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের পদে থাকা অবস্থায় এ বছরের এপ্রিলে সংরক্ষিত নারী আসনে তাকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি, আর সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হন তিনি।
মিষ্টির স্বামী নিউটনের রাজনীতিও শুরু ছাত্রদল দিয়ে; সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, তেজগাঁও কলেজে পড়ার সময় সংগঠনে যোগ দিয়ে ওয়ার্ড, থানা ও মহানগরের দায়িত্ব পেরিয়ে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হন, আর ২০০২ সালে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে কমিশনার নির্বাচিত হন। শপথের তিন দিনের মাথায়, সে বছরের ১০ মে ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ধানমন্ডিতে এসে অর্কিড প্লাজার এক সেলুন থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন নিউটন, তখনই তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়; তিনি নিহত হন, গুলিবিদ্ধ হন তার গাড়িচালকও, আর সেদিনই ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিউটনের মা রাবেয়া বেগম। সে সময় নিউটনের নামে ৩৬টি ফৌজদারি মামলা থাকার খবর প্রকাশ পেলেও মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছিল বিএনপি; হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত ২০০৬ সালের ২৪ মে রায়ে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, তবে হাইকোর্ট ২০১১ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের তিনজনকে খালাস দেন, কালা জাহাঙ্গীরসহ সাতজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন এবং বাকি তিনজনের যাবজ্জীবন বহাল রাখেন।
পুরান ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু, মিষ্টির বড় ভাই; ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ১৯৯৮-২০০০ মেয়াদে, সভাপতি ২০০০-২০০২ মেয়াদে, আর সভাপতি থাকাকালেই ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন ঢাকা-৮ আসন থেকে এমপি হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি তাকে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক করে। তবে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠনের আড়াই মাসের মধ্যেই, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এক প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির নিলাম-দরপত্রের নথি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে; ২৯ দিন পর জামিন পাওয়ার পর মামলাটিকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক উল্লেখ করে তৎকালীন বিএনপি সরকার প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় এবং ২০০৫ সালে তা প্রত্যাহার হয়।
২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের হওয়া পিলখানা হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর পিন্টুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়, যার বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছিলেন; জেলে থাকা অবস্থায় তিনি ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলেও সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় মনোনয়নপত্র টেকেনি। ২০১৫ সালের ৩ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে সেখানে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান বলে জানান চিকিৎসকেরা, আর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরিবার ও বিএনপি চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তোলে, চিকিৎসক রইস উদ্দিনও হাসপাতালে নিতে দেরি এবং আগের দিন কারাগারে গিয়েও পিন্টুর সঙ্গে দেখা করতে না পারার অভিযোগ তোলেন; কারা কর্তৃপক্ষ এবং সে সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করেছিলেন।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাটি হয় ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে; এরপর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ঝোলানো হয় এবং জানা যায়, সমিতিটির সভাপতি হিসেবে ২০০৬ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি বরাদ্দ চেয়ে যে আবেদন করা হয়েছিল, তাতে সই ছিল মিষ্টির, যিনি তখন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের (শাহ আলী থানা এলাকা) কমিশনার; সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে হামলার আয়োজনে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন স্থানীয় নেতার যুক্ত থাকার তথ্যও উঠে আসে। মিষ্টি অবশ্য বলছেন, বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র নেই, হামলায়ও তার কোনো ভূমিকা ছিল না; ঘটনার পর রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার মামলা করেছেন, যাতে আসামির তালিকায় হানিফ মিয়ার নাম রয়েছে, অজ্ঞাতনামা আসামি ২০০ থেকে ২৫০ জন। এ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিলুপ্ত করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের কমিটি, সেদিন মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল ও মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিএনপির তিন, ছাত্রদলের পাঁচ, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই ও শ্রমিক দলের চারজনকে বহিষ্কার করা হয়; বিএনপির কমিটি ভাঙার কারণ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো না হলেও যুবদল ও ছাত্রদলের দুটি কমিটির মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।






