লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতান অক্সফোর্ড স্ট্রিটের প্রায় এক কিলোমিটার অংশ যানবাহনমুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের আলোচনা ও পরিকল্পনার পর গত রোববার রাত আটটার দিকে সড়কটির ওই অংশ দিয়ে সর্বশেষ গাড়িটি চলাচল করে। এর মধ্য দিয়ে এলাকাটিকে পথচারীবান্ধব করে তোলার নতুন উদ্যোগের সূচনা হলো।

কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড়দিনের কেনাকাটার মৌসুমকে সামনে রেখে নেওয়া এই পদক্ষেপের পর ভবিষ্যতে সড়কটিতে সবুজ উন্মুক্ত স্থান, শিল্পকলা ও সংগীত আয়োজনের সুযোগও তৈরি করা হবে।

লন্ডনের মেয়র সাদিক খান জানিয়েছেন, অক্সফোর্ড স্ট্রিটের ঐতিহাসিক পরিচয় ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে এলাকাটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তাঁর পরিকল্পনায় এমন একটি পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে, যেখানে মানুষ শুধু কেনাকাটা নয়, অবসর কাটানো ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উপভোগের জন্যও আসবেন।

শতাব্দী পুরোনো বাণিজ্যিক ঐতিহ্য

অক্সফোর্ড স্ট্রিটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটেনের দীর্ঘ বাণিজ্যিক ইতিহাস। ১৮৬৪ সালে জন লুইস এখানে তাঁর প্রথম দোকান চালু করেন। এরপর ১৯০৯ সালে মার্কিন উদ্যোক্তা হ্যারি গর্ডন সেলফ্রিজ এই এলাকায় নতুন ধারার খুচরা ব্যবসার সূচনা করেন। আকর্ষণীয় দোকানের জানালা, বিনোদনের আয়োজন, রেস্তোরাঁ ও বিশ্রামের জায়গার মাধ্যমে তিনি কেনাকাটাকে আরও উপভোগ্য অভিজ্ঞতায় পরিণত করার চেষ্টা করেন।

মেয়র সাদিক খানের মতে, অক্সফোর্ড স্ট্রিটের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি এর উন্মুক্ত ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য পরিবেশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা এখানে কেনাকাটা, উৎসবের আলোকসজ্জা উপভোগ এবং নতুন ফ্যাশন ও সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আসছেন।

অর্থনীতিতে বড় অবদান

এলাকাটি শুধু কেনাকাটার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ব্রিটেনের অর্থনীতিতেও এর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। লন্ডন মেয়রের কার্যালয়ের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আশপাশের এলাকার অর্থনৈতিক উৎপাদন যুক্তরাজ্যের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক শতাংশের সমান ছিল।

চ্যালেঞ্জে ভোগা বাণিজ্যিক পরিবেশ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের বাণিজ্যিক পরিবেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনলাইন কেনাকাটার প্রসার, ভোক্তাদের পরিবর্তিত অভ্যাস এবং করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে সরাসরি কেনাকাটার প্রবণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় কিছু পরিচিত ব্র্যান্ডের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব দোকানের জায়গায় ভ্যাপ পণ্য ও মিষ্টি বিক্রির দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে।

পাশাপাশি যানজট, গাড়ির ধোঁয়া ও অতিরিক্ত শব্দের কারণে অনেকের কাছে এলাকাটিতে ঘোরাঘুরি করা আগের তুলনায় কম স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সড়কটিকে যানবাহনের চাপ থেকে মুক্ত করে পথচারীদের জন্য আরও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্রেতাদের পাশাপাশি পরিবার, পর্যটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী মানুষদেরও আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে।

ব্র্যান্ড বিনিয়োগ ও সমর্থনের দাবি

অক্সফোর্ড স্ট্রিটের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় বড় ব্র্যান্ডের ব্যবসা ফিরিয়ে আনা এবং কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সাজানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, লন্ডনের অধিকাংশ বাসিন্দা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে। ইতোমধ্যে আইকিয়া, পুমা ও ক্লার্কসের মতো পরিচিত ব্র্যান্ড সেখানে নতুন দোকানে বিনিয়োগ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

পরিকল্পনায় শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়, সবুজ উন্মুক্ত স্থান, শিল্পকলা ও সংগীতের জন্য জায়গা তৈরির বিষয়ও রয়েছে। এর ফলে অক্সফোর্ড স্ট্রিট ভবিষ্যতে কেনাকাটার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

অক্সফোর্ড স্ট্রিটকে যানবাহনমুক্ত করার উদ্যোগের লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রস্থলে গাড়ি ও মানুষের ব্যবহারের মধ্যে নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এতে পথচারীদের চলাচল আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি গাড়ির ধোঁয়া ও শব্দের বিরক্তিও কমতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রসার এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর। সামনের দিনগুলোতে এলাকাটিতে পর্যাপ্ত গণপরিবহন সুবিধা, কার্যকর যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নতুন সাংস্কৃতিক আয়োজন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসাগুলোর স্বার্থ ও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখাও জরুরি।

সব মিলিয়ে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের এই পরিবর্তন লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পরিকল্পিত রূপান্তর কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারিত হবে এর বাস্তব ফলাফল এবং ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

Source: জাগো নিউজ২৪