নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একবার সাহাবিদের উদ্দেশে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কি তাদের এমন কিছু আমলের কথা বলবেন, যেগুলো পালনে তাদের গুনাহ মাফ হবে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে? জবাবে সাহাবিরা বলেছিলেন, ‘অবশ্যই বলুন, ইয়া রাসুলাল্লাহ!’ এরপর নবীজি (সা.) এমন তিনটি আমলের কথা জানান, যেগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
এর প্রথমটি ‘ইসবাগ আলাল মাকারিহ’—অর্থাৎ শীতের কারণে কিংবা অসুস্থতার কারণে অজু করতে কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সেই কষ্ট উপেক্ষা করে পরিপূর্ণরূপে অজু করা। কেউ এভাবে কষ্ট সহ্য করে পূর্ণাঙ্গ অজু করলে তার গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বাকি দুটি আমল হলো মসজিদে বেশি বেশি পায়ে হেঁটে যাওয়া—অর্থাৎ দূরের পথ পেরিয়ে মসজিদে পৌঁছানো—এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা; কখন নামাজের সময় আসবে এবং কখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সমীপে সালাত নিবেদন করা যাবে, সেই অপেক্ষার প্রহর গোনা।
নবীজি (সা.) একবার সাহাবিদের সামনে হাউজে কাউসারের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি জানান, তিনি হাউজে কাউসার থেকে তাঁর উম্মতকে পানি পান করাবেন—অর্থাৎ যারা তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করেছেন এবং বেদাত থেকে দূরে থেকেছেন, কেয়ামতের সেই ভয়াবহতম দিনে যখন সবাই তৃষ্ণার্ত থাকবে, তখন তিনি তাদের হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করাবেন।
তখন সাহাবিরা প্রশ্ন করেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমাদের কীভাবে চিনবেন?’ অর্থাৎ তিনি তাঁর উম্মতের সবাইকে অন্যদের থেকে কীভাবে আলাদা করবেন এবং চিনবেন। জবাবে নবীজি (সা.) বলেন, অজু করা অঙ্গগুলো উজ্জ্বল থাকবে ও জ্বলজ্বল করবে; সেটি দেখে তিনি তাঁর উম্মতকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারবেন।
এই হাদিস থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়, কেয়ামতে নবীজির (সা.) হাতে হাউজে কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য দুনিয়ায় উত্তমরূপে অজু করা প্রয়োজন। তাহলে অজুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে, মানুষ অন্যদের থেকে পৃথক হতে পারবে এবং নবীজির (সা.) উম্মতের একজন সদস্য হিসেবে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে। এ ধরনের আরও বহু হাদিস রয়েছে, যেখানে নবীজি (সা.) নানা আমলের ফজিলত প্রসঙ্গে অজুর নির্দেশ দিয়েছেন এবং আলাদাভাবে ‘ইসবাগ’ বা উত্তমরূপে অজু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সারকথা হলো, অজু করতে হবে এবং সেই অজু যেন উত্তম ও পরিপূর্ণ হয়—এ বিষয়ে বিশেষ যত্নবান হতে হবে।
অজুর অঙ্গের কোনো অংশ শুকনো থাকা যাবে না
উত্তমরূপে অজু বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে বিশ্ববিখ্যাত হাদিস ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলী কারী (রহ.) তাঁর ‘মিরকাতুল মাফাতিহ’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, উত্তমরূপে অজু করার অর্থ হলো অজুর ফরজ ও সুন্নাহ—সবগুলো যথাযথভাবে আদায় করা। অর্থাৎ নবীজি (সা.) যেভাবে অজু করেছেন, ঠিক সেভাবে অজু করা; প্রত্যেক ফরজ, প্রত্যেক সুন্নাহ, প্রত্যেক মুস্তাহাব ও প্রত্যেক রোকন সর্বোচ্চ উত্তমভাবে এবং যেভাবে করতে বলা হয়েছে ঠিক সেভাবে আদায় করা। এটিই মূলত অজু সুন্দর করার অর্থ।
অজু সুন্দর করার আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় হাদিস থেকেই। সহিহ মুসলিমে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার নবীজির (সা.) সামনে এক ব্যক্তি অজু করে এলেন; তাঁর অজুর অঙ্গের কোথাও এক নখের জায়গা সমপরিমাণ অংশ শুকনো ছিল। নবীজি (সা.) সেই শুকনো জায়গা দেখে তাকে লক্ষ করে বলেন, ‘তুমি যাও, আবার অজু করো এবং অজু যেন সুন্দর হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে।’
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, অজু সুন্দর করার অর্থ অজুর অঙ্গগুলো উত্তমরূপে ধৌত করা, যাতে কোথাও কোনো অংশ শুকনো না থাকে। প্রায় একই বিষয়ে আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের পায়ের গিরা এবং গোড়ালিগুলোকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবে।’ অর্থাৎ এসব অংশ শুকনো থাকলে বা সেখানে অজুর পানি না পৌঁছালে তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। তাই পায়ের গিরা, গোড়ালি বা শরীরের যে অঙ্গগুলো শুকনো থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলো উত্তমরূপে ডলে ধুতে হবে, যাতে সেখানে পানি পৌঁছে ভালোভাবে ভিজে যায়। এটিও অজু উত্তমরূপে করার অন্যতম অর্থ।
পানি অপচয় নয়, মেসওয়াকও জরুরি
উত্তমরূপে অজু করার আরেকটি দিক হলো অজুতে পানির অপচয় না করা। কলের নিচে অজু করলে কেউ যেন কল ছেড়ে রেখে ব্রাশ করতে না থাকে এবং অযথা পানি নষ্ট না করে। আপাতদৃষ্টিতে পানির কোনো অভাব না থাকলেও যে পানি অপচয় করা হবে, তার জন্য কখনো না কখনো সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, অপচয় করতে স্পষ্টভাবে কোরআন ও হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। তাই অজুর মতো পবিত্র ইবাদত করার সময়ও কল ছেড়ে রেখে বা নানা ভাবে অহেতুক পানি নষ্ট করা যাবে না।
অজু পরিপূর্ণ ও উত্তমরূপে করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অজুতে মেসওয়াক করা, কারণ নবীজি (সা.) অজুতে মেসওয়াক করার নির্দেশ দিয়েছেন। আজকাল বেশিরভাগ মানুষ অজুতে মেসওয়াক করেন না, অনেকেই সঙ্গে মেসওয়াকও রাখেন না। অথচ নবীজির (সা.) জীবনের সর্বশেষ আমল ছিল এই মেসওয়াক; তিনি মেসওয়াক করতে করতেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন এবং অজুতে মেসওয়াকের আলাদা নির্দেশ দিয়েছেন। মেসওয়াকের সঙ্গে ইমানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, মৃত্যুর সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই যথাসাধ্য মেসওয়াক করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে অজুর সময় মেসওয়াক করলে নবীজি (সা.) যেভাবে অজু করতে বলেছেন, সেভাবেই তা আমাদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে এবং উত্তমরূপে অজু করার সেই কাঙ্ক্ষিত আমলটি করা যাবে।
বেগ চেপে জোর করে অজু ধরে রাখা নয়
উত্তমরূপে অজু করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চাপাচাপি করে অজু ধরে না রাখা। যেমন, কেউ অজু করে মাগরিবের নামাজ পড়ার পর ভাবলেন এই অজু দিয়েই ইশার নামাজ আদায় করবেন; প্রস্রাব বা বায়ুর বেগ চেপে রেখে ইশার নামাজ শেষ করার পর ওয়াশরুমে যাবেন—এটি অনুত্তম কাজ। এটি স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়, তাকওয়ার জন্যও ভালো কিছু নয়। বরং অলসতা না করে উত্তমরূপে অজু করতে হবে। বিশেষ করে শীতের দিনে অনেকে কোনো রকম যেনতেনভাবে পানি দিয়ে অজু সারার চেষ্টা করেন, সেটি করা যাবে না। অজুর অঙ্গগুলো যেন উত্তমরূপে ধোয়া হয়, সেই সঙ্গে পানি যেন অপচয় না হয়, অজুতে যেন মেসওয়াক করা হয় এবং বেগ চেপে রেখে কষ্ট করে অজু ধরে না রাখা হয়—তাহলেই অজু উত্তম বা সুন্দর অজু হিসেবে গণ্য হবে।
Source: জাগো নিউজ২৪





