ব্যস্ত সড়ক, ঐতিহাসিক অলিগলি কিংবা পর্যটকে ঠাসা স্কয়ার—ইস্তাম্বুলের প্রায় প্রতিটি মোড়েই চোখে পড়ে শিকে ঘুরতে থাকা বিশাল ডোনার কাবাব। দোকানের সামনে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও কর্মজীবীদের লম্বা লাইন বলে দেয়, এটি শুধু জনপ্রিয় খাবার নয়, শহরের দৈনন্দিন জীবন ও খাদ্যসংস্কৃতিরই অংশ।
সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত শহরের শত শত দোকানে বিরামহীন চলে ডোনার তৈরি। গরু, ভেড়া, খাসি বা মুরগির মাংস স্তরে স্তরে সাজানো হয় বড় ধাতব শিকে, তারপর আগুনের তাপে ধীরে সেঁকা হয়; বাইরের অংশ সোনালি হলে ধারালো ছুরিতে পাতলা করে কেটে রুটি, ভাত বা সবজির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। দোকানভেদে মসলা ও মেরিনেশনের কারণে স্বাদেও ভিন্নতা থাকে।
খাদ্য ইতিহাসবিদেরা বলেন, ডোনার কাবাবের জন্ম উনিশ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আমলে। এখন বিশ্বের নানা দেশে জনপ্রিয় হলেও এর আসল স্বাদ ও ঐতিহ্য সবচেয়ে ভালো টের পাওয়া যায় ইস্তাম্বুলেই, যেখানে রাঁধুনিরা অনেক ক্ষেত্রে এখনো বংশপরম্পরায় পাওয়া রেসিপি মেনে চলেন।
ডোনারের বাইরেও আছে কাবাবের নানা ধরন—আদানা, উরফা, শিশ, বেইতি ও ইস্কান্দার কাবাব দেশি-বিদেশি সবার কাছে সমান প্রিয়। ইস্কান্দার কাবাবে ডোনার মাংস পাতলা রুটির ওপর দিয়ে তাতে মেশানো হয় টমেটো সস, গলানো মাখন ও টক দই, যা ভোজনরসিকদের বিশেষ আকর্ষণ।
রেস্তোরাঁগুলোতে গরু, ভেড়া, খাসি ও মুরগির পাশাপাশি নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েও ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হয়; ভেড়ার অন্ত্রের বিশেষ গ্রিল ‘কোকোরেচ’ স্থানীয়দের প্রিয় স্ট্রিট ফুড। কোফতে, ধীরে সেঁকা ল্যাম্ব ও নানা ধরনের গ্রিলড মাংসও প্রতিদিন হাজারো মানুষের পাতে ওঠে।
দীর্ঘ অটোমান শাসন ইস্তাম্বুলের খাদ্যসংস্কৃতিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। সুলতানদের প্রাসাদের হেঁশেলে পারস্য, আরব, মধ্য এশিয়া, বলকান ও আনাতোলিয়ার রান্নার কৌশল মিশে তৈরি হয়েছিল নতুন নতুন পদ, যা পরে সাধারণ মানুষের ঘরে ছড়িয়ে পড়ে; আজও তুর্কি খাবারের প্রতিটি স্তরে তার ছাপ স্পষ্ট।
মূল খাবারের আগে আসে দই, বেগুন, ছোলা, মরিচ, জলপাই তেল ও সবজি দিয়ে তৈরি ছোট ছোট পদ ‘মেজে’, যা খিদে বাড়ায়; শেষে থাকে পেস্তা দেওয়া বাকলাভা, কুনেফে, সুতলাচ কিংবা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা তুর্কিশ কফি। স্থানীয়রা জানান, তুরস্কে একসঙ্গে খাওয়াকে পরিবার ও সমাজের বন্ধন মজবুত করার বড় উপলক্ষ মনে করা হয়, তাই রেস্তোরাঁয় পরিবার ও বন্ধুরা দীর্ঘ আড্ডার ফাঁকে খাবার উপভোগ করেন।



