তুরস্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী ইস্তাম্বুলে কফি শুধু পানীয় নয়, পাঁচ শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য আর আতিথেয়তার প্রতীক। গাঢ় রং ও ঘন টেক্সচারের এই কফি ‘জেজভে’ নামের ঐতিহ্যবাহী পাত্রে ধীরে ধীরে রান্না হয়; সম্প্রতি বসফরাসের তীরের শহরটির ক্যাফেগুলোতে কফিপ্রেমীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
ষোড়শ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের সময় ইস্তাম্বুলে কফির প্রচলন শুরু হয়। তখনকার কফি হাউস শুধু কফি খাওয়ার জায়গা ছিল না, ছিল কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের আড্ডার জায়গা এবং সামাজিক মেলবন্ধনের কেন্দ্র; সেই ধারা মেনে আজও প্রতিটি কাপ কফির সঙ্গে দেওয়া হয় এক গ্লাস পানি ও ‘টার্কিশ ডিলাইট’।
নিজস্ব প্রস্তুত প্রণালি ও সামাজিক রীতির জন্য তুর্কি কফি সংস্কৃতি ইউনেস্কোর ‘অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে; পারিবারিক আসর থেকে বিয়ে—সবখানেই এর উপস্থিতি। মাটির বা তামার পাত্রে বানানো এ কফির গুঁড়া কাপের তলায় থিতিয়ে নিতে সময় দেওয়া হয়, আর পান শেষে কাপ উল্টে পিরিচে রেখে তলানির দাগ দেখে ভাগ্য গণনার প্রথা ‘ফাল’ নামে পরিচিত।
কফির মতোই সমৃদ্ধ ইস্তাম্বুলের চা। কৃষ্ণসাগর উপকূলের ঢালু পাহাড়ে উৎপাদিত পাতা বিশেষ পাত্রে ধীরে ফুটিয়ে কড়া লিকার বানানো হয়, পরে তাতে গরম পানি মিশিয়ে কাচের গ্লাসে পরিবেশন করা হয়। সাধারণত একটি বড় পাত্রে গরম পানি আর ছোট পাত্রে কড়া লিকার রাখা হয়, যাতে অতিথি নিজের পছন্দমতো কড়া বা হালকা চা বানিয়ে নিতে পারেন।
ঐতিহ্যগতভাবে এ চা গাঢ় লিকারের কালো চা, যা দেওয়া হয় ছোট, সরু কোমরের স্বচ্ছ ‘টিউলিপ’ আকৃতির গ্লাসে। এতে চায়ের গাঢ় লাল রং সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে এবং সরু অংশটি চা অনেকক্ষণ গরম রাখে। তুর্কি চায়ে সাধারণত দুধ দেওয়া হয় না; কিছুটা তেতো হতে পারে বলে সঙ্গে থাকে চিনির কিউব, আর বাকলাভা বা টার্কিশ ডিলাইটের সঙ্গে এ চা জমে ভালো।
আপেল চা ও রোজ হিপের মতো ভেষজ চা-ও জনপ্রিয়, তবে খাঁটি কালো চায়ের কদর আলাদা। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে চা-ঘর; বসফরাসের পাশে বা সুলতানাহমেত এলাকার ক্যাফেতে বসে চা পানের অভিজ্ঞতা অনন্য, আর খাবারের পর কিংবা আড্ডায় তুর্কিরা সব সময় এ চা পান করেন।
ইস্তাম্বুলে চা কেবল পানীয় নয়, স্থানীয় সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার প্রধান প্রতীক। দোকান, রেস্তোরাঁ বা কারও বাড়িতে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা এখানকার রীতি।



