যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বড় কোনো সংকট-জরুরি পরিস্থিতি কখন তৈরি হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার নাগরিকদের কয়েক দিনের খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তিন দিনের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, সুইডেন ও নরওয়েতে এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা রয়েছে। এসব নির্দেশনা ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে সরকারের এই আহ্বানের পর কিছু প্রতিষ্ঠানে টিনজাত খাবার, রেডিও, টর্চলাইট ও পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি বেড়েছে।

তবে এমন প্রস্তুতির পরামর্শ মানেই আসন্ন যুদ্ধ বা বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস নয়। যুদ্ধের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ বন্ধ থাকা, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন কিংবা অন্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও এসব প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বাংলাদেশেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা হঠাৎ কোনো দুর্যোগে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। দোকানপাট বন্ধ থাকতে পারে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি দ্রুত বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। তাই বিপদের মুহূর্তে দিশেহারা না হয়ে আগে থেকেই বাড়িতে একটি জরুরি প্রস্তুতির কিট তৈরি রাখা ভালো। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এতে রাখা যায় নানা প্রয়োজনীয় জিনিস।

প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স

বাড়িতে সব সময় একটি প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স বা ফার্স্ট এইড কিট রাখুন। এতে ব্যান্ডেজ, তুলা, গজ, মেডিক্যাল টেপ, অ্যান্টিসেপটিক দ্রবণ, জীবাণুমুক্ত গ্লাভস, কাঁচি ও টুইজার রাখতে পারেন। ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়া বা আঘাতের ক্ষেত্রে এগুলো কাজে আসবে। পাশাপাশি থার্মোমিটার, ওরস্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও রাখুন। পরিবারের কারও নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হলে তাঁর কয়েক দিনের ওষুধ ও চিকিৎসকের নির্দেশনা সংরক্ষণ করুন।

পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার

জরুরি পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য কয়েক দিনের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা রাখুন। পাশাপাশি এমন খাবার মজুত করুন, যেগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। যেমন—বিস্কুট, মুড়ি, চিড়া, খেজুর, বাদাম, কিশমিশ, টিনজাত খাবার ও এনার্জি বার। শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের উপযোগী খাবারও আলাদা করে রাখুন। খাবারের মেয়াদ নিয়মিত পরীক্ষা করে পুরোনো খাবার বদলে ফেলুন।

টর্চলাইট, ব্যাটারি ও রেডিও

ঝড়, বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাড়িতে টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি এবং চার্জ দেওয়া যায় এমন জরুরি লাইট রাখুন। বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও জরুরি খবর শোনার জন্য ব্যাটারি বা হাতে ঘোরানো যায় এমন রেডিও কাজে আসতে পারে। মোবাইল ফোন সচল রাখতে পাওয়ার ব্যাংকও রাখুন এবং সেটি চার্জ দিয়ে প্রস্তুত রাখুন।

জরুরি কাগজপত্র ও যোগাযোগের নম্বর

জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং ব্যাংক ও বিমাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি একটি জলরোধী ফাইলে রাখুন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ডিজিটাল কপিও নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করতে পারেন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ফোন নম্বর, চিকিৎসকের যোগাযোগের তথ্য, নিকটস্থ হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের জরুরি নম্বর লিখে রাখুন। মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলেও যেন নম্বরগুলো পাওয়া যায়, সে জন্য কাগজে লিখে রাখা জরুরি।

প্রয়োজনীয় পোশাক ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী

জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত বাড়ি ছাড়তে হলে অতিরিক্ত পোশাক প্রয়োজন হতে পারে। তাই প্রত্যেক সদস্যের জন্য অন্তত এক সেট পোশাক, অন্তর্বাস, মোজা ও তোয়ালে গুছিয়ে রাখুন। সঙ্গে রাখুন সাবান, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, টিস্যু, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ময়লা ফেলার ব্যাগ। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা বিশেষ যত্ন প্রয়োজন এমন সদস্যের জন্য আলাদা সামগ্রী রাখুন।

জরুরি সরঞ্জাম ও সুরক্ষা সামগ্রী

বাড়িতে একটি ছোট সরঞ্জামের বাক্স রাখতে পারেন। এতে স্ক্রু ড্রাইভার, প্লায়ার্স, ডাক্ট টেপ, দড়ি, বাঁশি, কাজের গ্লাভস ও মাস্ক রাখা যায়। গ্যাস বা বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করার প্রয়োজন হলে কোন সুইচ বা ভালভ কোথায় রয়েছে, পরিবারের সবাইকে তা জানিয়ে রাখুন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাহায্য চাইতে বাঁশি কাজে আসতে পারে।

নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ

জরুরি পরিস্থিতিতে মোবাইল ব্যাংকিং বা এটিএম সেবা ব্যাহত হতে পারে। তাই বাড়িতে কিছু খুচরা নগদ টাকা নিরাপদ স্থানে রাখুন। পরিবারের কারও নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েক দিনের অতিরিক্ত ওষুধ সংরক্ষণ করুন। ওষুধের নাম, সেবনের নিয়ম ও অ্যালার্জির তথ্য লিখে রাখলে প্রয়োজনে অন্যরাও দ্রুত বুঝতে পারবেন।

শিশু, বয়স্ক ও পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা প্রস্তুতি

পরিবারে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা পোষা প্রাণী থাকলে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসও জরুরি কিটে রাখতে হবে। শিশুর খাবার, দুধ, ডায়াপার, অতিরিক্ত পোশাক ও পরিচর্যার সামগ্রী রাখুন। বয়স্ক সদস্যের চশমা, শ্রবণযন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যাটারি, চলাচলের সহায়ক সরঞ্জাম ও নিয়মিত ওষুধের ব্যবস্থা করুন। পোষা প্রাণীর খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সঙ্গে রাখুন।

জরুরি কিট কোথায় রাখবেন?

সব জিনিস একটি সহজে বহনযোগ্য ব্যাগ বা বাক্সে গুছিয়ে রাখুন। এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে পরিবারের যে কেউ দ্রুত সেটি নিতে পারবেন। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে কিটের অবস্থান জানিয়ে দিন। প্রতি তিন থেকে ছয় মাস পরপর খাবার ও ওষুধের মেয়াদ, পানির অবস্থা এবং ব্যাটারির চার্জ পরীক্ষা করুন। জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় আশ্রয় নেবেন, কীভাবে যোগাযোগ করবেন এবং বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ কোনটি—এসব বিষয়েও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করুন।

জরুরি প্রস্তুতি মানেই আতঙ্কিত হওয়া নয়, বরং সম্ভাব্য বিপদের সময় নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ রাখার পরিকল্পনা করা। কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখার অভ্যাস কঠিন পরিস্থিতিতে অনেকটাই সহায়ক হতে পারে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এসএকেওয়াই

Source: জাগো নিউজ২৪