দেশে চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের জন্য সরকারের পরিকল্পনার অভাব, জ্বালানি কেনায় সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল অগ্রাধিকারকে দায়ী করেছেন সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রস্তাবও দেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ ও অস্থিরতা পরিস্থিতিকে কঠিন করলেও এর পুরো দায় যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালির ঘাড়ে চাপানো যায় না।
পোস্টে তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ বাধার পর প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ৬০ ডলার থেকে ৮৫–৯০ ডলারে পৌঁছালেও সরকার সময়মতো দাম সমন্বয় করেনি, বাড়তি ভর্তুকির চাপ সামলানোর অর্থায়ন পরিকল্পনাও ছিল না; ফলে মার্চে বিদ্যুৎ বিভাগকে বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির জন্য চিঠি পাঠাতে হয়। নাহিদের অভিযোগ, সেই চাপ সামলাতে সরকার এমন খাতে খরচ কমিয়েছে যার ধাক্কা সরাসরি উৎপাদনে লেগেছে: কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র এবং আমদানি করা বিদ্যুতের বিল বকেয়া পড়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো যায়নি, কয়লার জোগান ব্যাহত হয়েছে, আমদানিও কমেছে। ক্যাপাসিটি চার্জ বা আইপিপির ফিক্সড পেমেন্টে হাত না দিয়ে উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত খাতে কাটছাঁট করাকে তিনি সাশ্রয় নয়, বরং অগ্রাধিকার ঠিক করতে না পারার ব্যর্থতা বলে বর্ণনা করেন।
কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনাতেও ঘাটতি আছে অভিযোগ করে তিনি জানান, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুনের পর দিনে প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়; দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু তখন বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকার কথা। তার দাবি, সে সময়েই ভারত থেকে আসা ডিজেলের পরিমাণ অর্ধেকে নামে, আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও পড়ে যায়। ঝাড়খণ্ড থেকে আদানির বিদ্যুৎ, ভারত থেকে ডিজেল কিংবা ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের কয়লা—এর কোনোটিই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে নাহিদ প্রশ্ন তোলেন, তাহলে সরবরাহ কেন কমল, সরকারকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে; তার মতে, যুদ্ধের চেয়ে বকেয়া অর্থ, কেনাকাটার সূচি ও জ্বালানি পরিকল্পনার ঘাটতিই এর বড় কারণ।
জ্বালানির বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ দাবি করেন, দাম সমন্বয়ের আগে পাম্পে তেল না পেয়ে মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হলেও দাম বাড়ানোর পরপরই সেই লাইন মিলিয়ে যায়, অর্থাৎ সংকটের একাংশের পেছনে ছিল মজুত ব্যবস্থাপনা; অথচ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অপরিশোধিত তেল কেনার সূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী চিঠি দেওয়ার পরপরই বেসরকারি খাতে আমদানির নীতিমালার খসড়া তলব করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, সংকট না সামলে একে বেসরকারিকরণের যুক্তি বানানো হচ্ছে। সোলার হোমে শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে ১৭ শতাংশ শুল্ক বসানো এবং ছোট ও বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
পিজিসিবির তথ্য উদ্ধৃত করে নাহিদ জানান, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দৈনিক সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা ও জুলাইয়ে ৩২ হাজার, আর আগস্টে তা ৫৩ হাজার থেকে ৬২ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টায় উঠেছে বলে তার দাবি; ১০ আগস্ট রাত ১টার দিকে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তার অভিযোগ, গ্রামে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলেপল্লিতে দুই সপ্তাহ ধরে মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না, বেশির ভাগ বরফকল বন্ধ, আর শিল্পকারখানা, সেচ, শিক্ষা ও হাসপাতালের মতো খাত ক্ষতির মুখে। যুদ্ধ যে পরিস্থিতি কঠিন করেছে, তা মেনে নিয়েও তিনি বলেন, সংকট এতটা তীব্র হওয়ার মূলে রয়েছে সরকারের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হাতে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান—এই তিন নথি থাকা জরুরি বলে মনে করেন নাহিদ; কোন মাসে কত জ্বালানি লাগবে, কবে অর্ডার দিতে হবে আর কত টাকা দরকার, তা ফুয়েল প্ল্যানে ঠিক করা থাকে এবং এসব নথি হালনাগাদ থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি সামলানো সহজ হতো বলে তার দাবি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর আগের দায়িত্বকাল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি; তার দাবি, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের মে—এই সময়ে মন্ত্রী বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন এবং তখন মানুষ নিয়মিত লোডশেডিং দেখেছে, আর প্রায় দুই দশক পর একই মন্ত্রণালয়ে ফিরে কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। নাহিদ বলেন, এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, পারফরম্যান্সের প্রশ্ন; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থির এই সময়ে মন্ত্রণালয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার।
ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ করিডোর নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নাহিদ দাবি করেন, ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ বিভাগ ৭৬৫ কেভি কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর সঞ্চালন লাইন ও ভারতের সঙ্গে পাওয়ার কানেক্টিভিটি নিয়ে আবার তৎপর হয়েছে, যার আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ দেওয়া নয়, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ, সম্ভবত অরুণাচল প্রদেশের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পরিকল্পিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নেওয়া। যমুনা-ব্রহ্মপুত্রকে দেশের স্বাদু পানির অন্যতম প্রধান উৎস উল্লেখ করে এবং ফারাক্কা (গঙ্গা) ও গজলডোবার (তিস্তা) অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যমুনার উজানে আবার এমন কিছু বাংলাদেশ মানতে পারে না; ভারত, নেপাল কিংবা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ কেনায় তার আপত্তি নেই, তবে নদীর ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে করিডোর হতে পারে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য উল্লেখ করে তিনি এনসিপির সমাধান প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং করিডোর প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।






