পবিত্র কোরআনে যাঁর নাম দুই জায়গায় এসেছে, সেই নবী হজরত ইলিয়াস (আ.) আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী। ইসরাইলি কিতাবসমূহে তাঁকে ‘ইলিয়া’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি আল্লাহর নবী হজরত হারুনের (আ.) বংশধর।
কোরআন মজিদে প্রথমে নবীদের একটি দলের প্রসঙ্গে তাঁর নাম এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াস—তাঁরা সবাই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা আনআম: ৮৫)
দ্বিতীয় জায়গায় বর্ণিত হয়েছে তাঁর দ্বীন প্রচারের ঘটনা। ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই ইলিয়াস ছিলেন রাসুলদের একজন। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি ভয় কর না? তোমরা কি বাআল দেবতার পূজা করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করবে? যিনি আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও পালনকর্তা?’ তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। ফলে তারা অবশ্যই শাস্তির জন্য গ্রেপ্তার হয়ে আসবে। তবে আল্লাহর খাঁটি বান্দাগণ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি পরবর্তীদের মধ্যে এ বিষয়ে রেখে দিয়েছি যে, ইলিয়াসের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা সাফফাত: ১২৩-১৩২)
তাফসিরে যা বর্ণিত
পূর্ববর্তী কিতাবের অনুসারীদের বর্ণনার সূত্রে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের পণ্ডিতদের ভাষ্য থেকে নবী ইলিয়াসের (আ.) ঘটনা বিভিন্ন তাফসিরের কিতাবে এসেছে। বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে নবী হিযকীলের (আ.) পর বনি ইসরাইলের কাছে পাঠান। বনি ইসরাইলের লোকেরা ‘বাআল’ নামের একটি মূর্তির পূজা করত। তিনি তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদত করতে নিষেধ করেন।
বর্ণনায় আরও আছে, তাদের রাজা প্রথমে তাঁর প্রতি ইমান এনেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যান। অন্য বেশিরভাগ মানুষ ভ্রষ্টতার ওপরই অবিচল থাকে। তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। ফলে তিন বছর তাদের ওপর বৃষ্টি বন্ধ থাকে। এরপর তারা তাঁর কাছে কষ্ট দূর করার অনুরোধ জানায় এবং প্রতিশ্রুতি দেয় যে, বৃষ্টি বর্ষিত হলে তারা তাঁর প্রতি ইমান আনবে। তিনি তাদের জন্য দোয়া করেন এবং মুষলধারে বৃষ্টি নামে। কিন্তু তারা ইমান আনে না।
এরপর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যেন আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন অমুক স্থানে যান এবং সেখানে তাঁর সামনে যা-ই আসবে তার ওপর সওয়ার হন, ভয় না পান। নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় গেলে তাঁর কাছে আগুনের একটি ঘোড়া আসে এবং তিনি ঘোড়াটির ওপর সওয়ার হন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নূরের পোশাক ও ডানা পরিধান করিয়ে দেন এবং তিনি ফেরেশতাদের সঙ্গে উড়তে থাকেন। এভাবে তিনি ফেরেশতা ও মানুষ এবং আসমানি ও জমিনি—উভয় সত্তার অধিকারী হয়ে ওঠেন।
নবী ইলিয়াসের এ ঘটনা ইবনে কাসির (রহ.) ও তাবারি (রহ.) ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসির ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, ওয়াহাব এটি আহলে কিতাবদের থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, আর এর সত্যতা সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন।
কোরআন থেকে যা নিশ্চিত
কোরআনের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের কাছে কোনো এক যুগে তাঁর নবী ইলিয়াসকে (আ.) পাঠিয়েছিলেন, যখন তারা ‘বাআল’ নামের মূর্তির পূজা করত। ইলিয়াস (আ.) তাদের মূর্তিপূজার তীব্র সমালোচনা করেন এবং একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। তিনি তাদের জানান, আল্লাহই তাদের রব এবং তাদের পূর্বপুরুষদেরও রব। কিন্তু তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। আল্লাহ তাআলা তাদের কেয়ামতের দিনের আজাবের ভয় দেখান, তবে দুনিয়াতে তাদের কোনো শাস্তির কথা উল্লেখ করেননি।
আল্লাহ আরও জানিয়েছেন, যাদের তিনি খাঁটি বান্দা হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং তাঁর নবীর অনুসরণের তৌফিক দিয়েছেন, তারা এ আজাব থেকে মুক্ত থাকবে এবং আল্লাহর কাছ থেকে মহাপ্রতিদান পাবে। ঘটনার শেষে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের মধ্যে দাওয়াতের মহান কাজ আঞ্জাম দেওয়ার কারণে ইলিয়াস আলাইহিস সালামের প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে ও তাঁর বান্দাদের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য রয়েছে সালাম বা অভিবাদন। ইলিয়াস (আ.) সম্পর্কে এতটুকু ঘটনা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা যায়। এর বাইরের তথ্য বা বর্ণনা পর্যালোচনার অবকাশ রাখে।
ঘটনা থেকে শিক্ষণীয়
কোরআনের অন্য ঘটনার মতো নবী ইলিয়াসের (আ.) ঘটনাও আল্লাহ তাআলা কেবল ঐতিহাসিক তথ্য বা নিছক গল্প বলার জন্য উল্লেখ করেননি; এর উদ্দেশ্য উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী যেসব জাতি ও সম্প্রদায় আল্লাহর বিধান অমান্য করেছিল ও রাসুলদের আনা হেদায়েত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তাদের পরিণতি থেকে সতর্ক হওয়া।
এক. সুরা সাফফাতে বেশ কয়েকজন নবীর ঘটনার সঙ্গে নবী ইলিয়াসের ঘটনা আনা হয়েছে রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে—নবীগণ বছরের পর বছর দাওয়াত দেওয়ার পরও কাফেরদের কুফরের ওপর অটল থাকার প্রবণতা নতুন নয়। একই সঙ্গে এটি মক্কার মুশরিকদের জন্য সতর্কবার্তা ও হুমকি যে, তারা যদি কুফরির ওপর অবিচল থাকে, তবে দুনিয়া অথবা আখেরাতে তাদের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
দুই. এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, দ্বীনের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো শিরক ত্যাগ করে তাওহিদের অনুসারী হওয়া এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের রব, আমাদের পূর্বপুরুষদেরও রব। মানুষের আদিপিতা আদম (আ.) আল্লাহর বিশ্বাসী বান্দা ও নবী ছিলেন। তার পরেও বহু কাল মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করত না। পরবর্তীতে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষের মধ্যে কুফরি ও শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
তিন. নবী ইলিয়াসের (আ.) ঘটনায় এ বার্তাও রয়েছে যে, রাসুলের দায়িত্ব কেবল দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। তাঁর দাওয়াতকে যারা মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে, দুনিয়াতে তাদের শাস্তি বা ধ্বংস নিজের চোখে দেখা রাসুলের জন্য আবশ্যক নয়। নবীর দায়িত্ব মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং তা স্পষ্ট করে দেওয়া। তাদের হিসাব নেওয়া এবং তাদের ওপর আজাব নাজিল করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ তাদের ওপর আজাব তখনই নাজিল করবেন, যখন তাঁর নির্ধারিত সময় আসবে। সেই সময় এলে তারা আর এক মুহূর্তও সুযোগ পাবে না। এ অর্থেই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে (সা.) সম্বোধন করে অন্য আয়াতে বলেন, ‘আমি তাদের যে ওয়াদা দিয়েছি তার কিছু অংশ যদি তোমাকে (তোমার জীবনেই) দেখিয়ে দিই অথবা (তার আগেই) তোমার মৃত্যু ঘটাই, পরিশেষে তারা তো আমার কাছেই ফিরে আসবে।’ (সুরা গাফির: ৭৭)
কোরআনে বর্ণিত এ ঘটনার মূল নির্যাস হলো, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য যত উপাস্য আছে—তা পাথর হোক কিংবা মানুষ—সবকিছু বর্জন করতে হবে। আল্লাহর সঙ্গে যারা শিরক করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। দুনিয়াতে তারা শাস্তি না পেলেও আখেরাতে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে।
Source: জাগো নিউজ২৪






