ইসলাম এমন সমাজব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদ ভোগ করবে এবং অন্যের সম্পদে অন্যায়ভাবে হাত দেবে না। মানুষের জীবন, মাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে ইসলামের প্রাথমিক সামাজিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণেই চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, জুয়া, সুদ ও ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন এবং বলপ্রয়োগে অন্যের জমি দখল ইসলামে নিষিদ্ধ। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা কেবল সামাজিক অপরাধই নয়, এটি ইমানেরও পরিপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মুমিনকে সর্বক্ষেত্রে বৈধতার সীমা মেনে চলতে হয়।

বৈধ ও অবৈধ পথের পার্থক্য

সম্পদ অর্জনের বৈধ ও অবৈধ পদ্ধতি নিয়ে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর মত অনুযায়ী, মানুষ পৃথিবীর সম্পদ ভোগ করবে মালিকানার ভিত্তিতে; অর্থাৎ যে সম্পদের বৈধ মালিকানা কারও রয়েছে, কেবল সে-ই তা ভোগদখল করতে পারবে। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা কারও জন্য বৈধ নয়।

তিনি সম্পদের মালিকানা অর্জনের কয়েকটি বৈধ উপায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মালিকবিহীন সম্পদ বা অনাবাদি জমি নিজের অধিকারে নেওয়া, বৈধ মালিকের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, কোনো কিছুর বিনিময়ে ক্রয় করা এবং মালিকের সন্তুষ্টিতে উপহার বা দান হিসেবে গ্রহণ করা। এ ছাড়া নিজের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোও মালিকানা অর্জনের বৈধ উপায়। উদাহরণ হিসেবে জমি আবাদ করে ফসল ফলানো কিংবা গবাদিপশু প্রতিপালন করে বংশবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে অন্যের ক্ষতি করা বা সমাজের স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করা যাবে না।

অন্যদিকে সম্পদ অর্জনের কিছু পদ্ধতি বাহ্যত লাভজনক মনে হলেও তা বৈধ নয়। শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.)-এর মূলনীতি অনুযায়ী, পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও উপকার সাধিত হয় না—এমন পন্থায় সম্পদ গ্রহণ অবৈধ। যেমন জুয়া। এতে এক পক্ষের সম্পদ অন্য পক্ষের হাতে চলে যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কারও প্রয়োজন পূরণ বা পারস্পরিক সহযোগিতা হয় না। একইভাবে সুদও অবৈধ। কারণ এতে এক পক্ষের লাভ হলেও অন্য পক্ষের ওপর ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে পড়লেও তাকে সুদসহ ঋণ পরিশোধের দায় বহন করতে হয়। ফলে এ ধরনের লেনদেন ব্যক্তির পাশাপাশি সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর।

যে যে পথে সম্পদ আত্মসাৎ হয়

১. ঘুষ ও বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার: বিচারককে ঘুষ দিয়ে, প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে অন্যের সম্পদ নিজের পক্ষে নিয়ে নেওয়া—যদিও তা আইনিভাবে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে—তবুও ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)

অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও প্রভাব খাটানো ছাড়াও বিচারক ভুল করতে পারেন। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাদী ও বিবাদী উভয়েই আত্মপক্ষ সমর্থনে কথা বলেন। হতে পারে অন্যায়ভাবে যার জমি দখল করা হয়েছে, তিনি কথায় পটু নন, তাই নিজের হক আদায়ে শক্তভাবে কথা বলতে পারেননি। অন্যদিকে অন্যায়ভাবে দখলকারী স্পষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সেই জমির মালিকানা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। এ ক্ষেত্রে বিচারক স্বাভাবিকভাবে দখলকারীর পক্ষেই রায় দেবেন। এতে বিচারক দোষী হবেন না, কিন্তু দখলকারী অবশ্যই জাহান্নামে যাবে। হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার কাছে মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে আস। আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো প্রতিপক্ষের তুলনায় সাক্ষী-প্রমাণ পেশ করার ব্যাপারে বেশি বাকপটু। তবে জেনে রেখ, বাকপটুতার কারণে যার পক্ষে আমি তার ভাইয়ের প্রাপ্য হক দিয়ে দিই, তার জন্য আসলে আমি জাহান্নামের অংশ নির্ধারণ করে দিই। কাজেই, সে যেন তা গ্রহণ না করে।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৮০)

২. মিথ্যা কসম খেয়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথ সামান্য মূল্যে বিক্রি করে, আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা আলে ইমরান: ৭৭)

৩. সুদের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন: সুদের লেনদেনে এক পক্ষের লাভের বিপরীতে অন্য পক্ষের ওপর ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সুদ গ্রহণ ও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণের নিন্দা করে বলেন, ‘তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল এবং অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার কারণে। আর তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নিসা: ১৬১)

৪. ওজনে কারচুপি ও মাপে কম দেওয়া: কেনাবেচায় পরিমাণ কম দিয়ে ক্রেতার সম্পদ আত্মসাৎ করাও গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ১–৩)। অন্য আয়াতে বলেন, ‘আর যখন তোমরা মাপবে, তখন পূর্ণ মাপে মাপবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক থেকে অধিক ভালো।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৫)

৫. জুয়া: জুয়া এমন এক পদ্ধতি, যেখানে একজনের সম্পদ অন্যজনের হাতে চলে যায়; অথচ এর মাধ্যমে পারস্পরিক কোনো উপকার সাধিত হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্য নির্ধারণী তীর অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা মায়েদা: ৯০)

৬. চুরি: অন্যের সম্পদ না বলে গ্রহণ করাই চুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও—তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিস্বরূপ। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়েদা: ৩৮)

৭. ডাকাতি ও সশস্ত্র ছিনতাই: অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়া এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করা আরও গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। পৃথিবীতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা এবং আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা মায়েদা: ৩৩)

৮. জমি ও সম্পদ জবরদখল: নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমিও দখল করে, কেয়ামতের দিন সাত স্তর জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৫৩)

শিক্ষা

অপরাধগুলোর ধরন ভিন্ন হলেও প্রতিটির লক্ষ্য এক—অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে নিজের সম্পদ বাড়ানো। ইসলাম এ ধরনের অন্যায় উপার্জনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ মানুষের সম্পদ ও মালিকানার অধিকার সুরক্ষিত না থাকলে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয় না, পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে না এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে না।

Source: জাগো নিউজ২৪