উঁচু ভবন, ব্যস্ত জীবন আর নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধনের শহর নিউইয়র্কের ইয়ংকার্সে হিটিং ও কুলিং খাতে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন প্রবাসী বাংলাদেশি তোফায়েল চৌধুরী লিটন। বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার এই বাসিন্দা দুই দশকেরও বেশি আগে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান; জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা লিটন একসময় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতেন। প্রায় ছয় বছর আগেও নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে কাপড় ও খাবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
গতানুগতিক ধারার বাইরে নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে তিনি নিউইয়র্ক স্টেট সরকারের একটি বড় পাইলট প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেন, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানো; সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করে ‘গ্রি মেকানিক্যাল ইয়াং কার্স’। শুরুর পথ সহজ ছিল না, তবে নেতৃত্বে সততা, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততাকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে মূলধারার বাজারে জায়গা করে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। আমেরিকান ও চীনা বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে এটি গোল্ড কন্ট্রাক্টরের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি এখন নিউইয়র্ক স্টেট ও আশপাশের এলাকায় হিটিং ও কুলিং ব্যবস্থার জন্য সরকারি ফান্ডিং ও নানা সুবিধা গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। লিটন জানান, নিউইয়র্ক সিটিকে গ্রিন সিটি হিসেবে গড়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চালু একটি প্রকল্পের আওতায় তার প্রতিষ্ঠান ফ্রি ড্রয়ার দিচ্ছে। তার ভাষ্য, অন্য কমিউনিটির লোকজন এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন।
ব্যবসার পরিধি বাড়তে বাড়তে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রুপ অব কোম্পানি। হিটিং ও কুলিং ইনস্টলেশনের জন্য রয়েছে আলাদা ও সুসংগঠিত দল ‘এআই মাইডিয়া মেকানিক্যাল’, আর সম্প্রতি বড় পরিসরে চালু হয়েছে ‘নর্থ আমেরিকা হিটিং অ্যান্ড কুলিং ইলেকট্রিক্যাল সাপ্লাই হাউস’, যেখান থেকে বাংলাদেশি ও আমেরিকান ঠিকাদারেরা পাইকারি দামে সরঞ্জাম পান। প্রধান কার্যালয় ইয়ংকার্সে হলেও প্রতিষ্ঠানটি নিউইয়র্কজুড়ে কাজ করে; লং আইল্যান্ড ও ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতেও এর অফিস আছে।
ইলেকট্রনিক ব্যবসার জন্য জমি কিনে দশ হাজার বর্গফুটের একটি হোলসেল ডিপো তৈরি করেছেন লিটন, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রচুর পণ্য বিক্রি হয়; আমদানি করা পণ্য রাখতে গড়েছেন ৪০ হাজার বর্গফুটের ওয়্যারহাউস। তার প্রতিষ্ঠানে এখন নিয়মিত কাজ করছেন প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ জন দক্ষ কর্মী, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন; বিভিন্ন দেশের এই কর্মীর সংখ্যা চলতি মাসেই পঞ্চাশে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ব্যবসাটি অনলাইনে পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে তার, যাতে আরও কর্মসংস্থান তৈরি হয়; পাশাপাশি আবার রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ফেরার ইচ্ছাও রয়েছে।
লিটনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকলেই বাংলাদেশের রূপ, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা চোখে পড়ে; ছয়টি ডেলিভারি ভ্যানে বাংলা হরফে লেখা আছে, ‘এ আই মাইডিয়া মেকানিক্যাল কর্প’ একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় আমেরিকান গ্রাহকেরা এলে ব্যবসার আলাপের ফাঁকে তিনি দেশের হস্তশিল্প, সুস্বাদু খাবার ও আতিথেয়তার ঐতিহ্যের গল্প শোনান; এসব ঐতিহ্যকে তিনি নিজের ব্যবসায়িক দর্শনের অংশ করে নিয়েছেন। লিটন বলেন, ব্যবসা করে অনেকেই অর্থ উপার্জন করেন, কিন্তু বিদেশে নিজের দেশকে সঠিকভাবে তুলে ধরার আত্মতৃপ্তি অন্য কিছুতে মেলে না; আমেরিকানরা তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনে এ দেশের মানুষের পরিশ্রম ও আতিথেয়তার প্রশংসা করলে প্রবাসজীবনের কষ্ট সার্থক মনে হয় তার।
বাংলাদেশ সরকার দেশকে গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্রে রূপ দিতে যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, সেখানে অভিজ্ঞতা আর কারিগরি জ্ঞান নিয়ে পাশে থাকতে চান লিটন। প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের মতে, তার এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গর্বের; সততা, কর্মনিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের এই গল্প বিশ্বে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করবে বলে তারা আশা করেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করে অনেক বাংলাদেশি সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।






